আ’লীগ তৃণমূলের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়

উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের তৃণমূলের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় জমেছে। জেলা-উপজেলা নেতাদের বিরুদ্ধে ত্যাগী ও যোগ্যদের বাদ দিয়ে অযোগ্য ও বিতর্কিত এবং নিজেদের পছন্দের কিংবা আত্মীয়-স্বজনকে প্রার্থী হিসেবে কেন্দ্রে নাম পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে। মনোনয়নবাণিজ্যের কারণে বাদ পড়ে যাচ্ছেন বর্তমান চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানসহ জনপ্রিয় সম্ভাব্য প্রার্থীরাও। প্রভাবশালী স্থানীয় এমপিদের হস্তক্ষেপেও কোথাও কোথাও দলীয় প্রার্থী বাছাইয়ে অনিয়মের ঘটনা ঘটছে। সবমিলিয়ে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের প্রার্থী বাছাইকে ঘিরে তৃণমূলের প্রায় সর্বত্র দ্বন্দ্ব-কোন্দল ছড়িয়ে পড়েছে। অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠতে শুরু করেছেন বঞ্চিত প্রার্থীরা। দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার ধানমণ্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে অসংখ্য লিখিত এবং মৌখিক অভিযোগ জমা পড়েছে। বাদপড়া জনপ্রিয় প্রার্থীর কেউ কেউ অভিযোগ জানিয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কাছে। দলের নীতিনির্ধারক ও কেন্দ্রীয় নেতাদের বাসভবন ও অফিসেও ভিড় জমাচ্ছেন ক্ষুব্ধ অনেক প্রার্থী। দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছেও এসব অনিয়মের খবর পৌঁছে গেছে। আগামী ৮ ও ৯ ফেব্রুয়ারি প্রার্থী চূড়ান্ত করার আগেই দলীয় প্রধান এসব অভিযোগের ফয়সালা করবেন- এমনটাই প্রত্যাশা করছেন সংশ্নিষ্ট নেতারা। 

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এ বিষয়ে বলেছেন, যাচাই-বাছাই শেষে যোগ্য, ত্যাগী ও জনপ্রিয়দেরই উপজেলায় মনোনয়ন দেওয়া হবে। অনেক উপজেলায় প্রভাব খাটিয়ে স্থানীয় নেতা ও এমপিদের নিজেদের লোক এমনকি আত্মীয়-স্বজনদের নাম পাঠানোর বিষয়ে গতকাল বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, মনোনয়নপত্র খতিয়ে দেখব। এখানে কে কার ভাই বা বোন এসব কোনো প্রশ্ন নয়। জনগণের কাছে কার জনপ্রিয়তা কতটুকু, কে উইনেবল, কে ইলেকটেবল- সেগুলোও আমরা খতিয়ে দেখব। 

ওবায়দুল কাদের আরও বলেন, ‘আমরা উপজেলায় একটি বর্ধিত সভায় প্রার্থীদের নাম নির্ধারণের জন্য বলেছিলাম। ওই সভায় যদি কোনো আত্মীয়ের নাম চলে আসে, তাহলে তো কিছু করার নেই। তাছাড়া আত্মীয় পরিচয়ের কারণে কারও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চাপা পড়ে যাবে- সেটাও তো হতে পারে না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের প্রার্থী বাছাইয়ে তৃণমূল থেকে নাম চেয়েছিল আওয়ামী লীগ। বর্ধিত সভা করে সর্বোচ্চ তিনজন করে প্রার্থীর নাম সুপারিশ করে কেন্দ্রে তালিকা পাঠানোর নির্দেশনা দিয়ে চিঠি পাঠানো হয় জেলা-উপজেলা কমিটিগুলোকে। কিন্তু দলের অনেক জেলা-উপজেলা সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকই কেন্দ্রের এ নির্দেশনা না মেনে চেয়ারম্যান পদে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীর নাম ‘একক প্রার্থী’ হিসেবে কেন্দ্রে পাঠিয়ে দিয়েছেন। আবার দলীয় গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন করে জেলা-উপজেলা ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ ছাড়াই স্থানীয় এমপিরাও একক প্রার্থী হিসেবে আত্মীয়-স্বজনের নাম পাঠিয়ে দিয়েছেন। অনেক জেলার বিত্তশালী প্রার্থীরা টাকার বিনিময়ে জেলা-উপজেলার নেতাদের ম্যানেজ করে নিজেদের নাম কেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছেন। বরিশাল, বগুড়া ও পটুয়াখালীসহ অনেক জেলা থেকেই এমন অভিযোগ আসার প্রেক্ষাপটে কেন্দ্র থেকে দলীয় মনোনয়নপত্রের ফরম বিক্রি সবার জন্যই উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। 

দলীয় সূত্রগুলো বলছে, দলের মধ্যে আগে থেকেই সিদ্ধান্ত ছিল, তৃণমূলের পাঠানো তালিকায় যাদের নাম থাকবে- তারাই কেবল দলীয় মনোনয়নপত্রের ফরম সংগ্রহ করতে পারবেন। কিন্তু পরে দেখা যায়, তৃণমূল থেকে পাঠানো নামের তালিকায় বর্তমান চেয়ারম্যান কিংবা জয়লাভে সক্ষম এমন প্রার্থীদের নাম নেই। ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে বিএনপি-জামায়াত থেকে দলে যোগ দেওয়া ‘হাইব্রিড’ নেতাদের নামও পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোথাও আবার নানা অপকর্মের দায়ে দল থেকে বহিস্কৃত নেতাদের নামও প্রার্থী হিসেবে পাঠানো হয়েছে। এ অবস্থায় চলমান দলীয় মনোনয়নপত্রের ফরম বিতরণের কার্যক্রমে সবার জন্য ফরম ক্রয় উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। 

এ ছাড়া প্রার্থিতা নিয়ে দ্বন্দ্ব-কোন্দল ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় ভাইস চেয়ারম্যান ও সংরক্ষিত মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদের প্রার্থী বাছাইয়ের আগের সিদ্ধান্ত থেকেও সরে এসেছে আওয়ামী লীগ। এর আগে সিদ্ধান্ত ছিল, এই দুটি পদের নির্বাচন উন্মুক্ত থাকবে। তবে বেশিরভাগ উপজেলায় এই দুটি পদে অসংখ্য প্রার্থী থাকায় কোন্দল ব্যাপক আকার ধারণ করে। এ অবস্থায় এই দুটি পদেও দলীয়ভাবে প্রার্থী ঠিক করে দিতে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে ফরম বিতরণ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। 

অভিযোগের শেষ নেই :পাবনা জেলার আটঘরিয়া উপজেলার চেয়ারম্যান পদের প্রার্থী তালিকায় এক নম্বরে রাখা হয়েছে পাবনা জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও পাবনা-৪ আসনের এমপি শামসুর রহমান শরীফ ডিলুর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ইশারত আলীর নাম। ২০০৯ সালের উপজেলা নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করেছিলেন তিনি। এমনকি গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দলের বিরুদ্ধে কাজ করার দায়ে আওয়ামী লীগ থেকে বহিস্কৃতও হয়েছিলেন। সর্বশেষ ২০১৬ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ইশারত আলীর ছোট ভাই আবু হানিফ ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেন। ওই নির্বাচনে তার ভাইয়ের পক্ষে ধানের শীষে ভোট চান ইশারত। এখন তাকেই উপজেলা চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হিসেবে নাম পাঠানোর ঘটনায় এলাকায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। 

অভিযোগ উঠেছে, এই উপজেলায় চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী ও ছাত্রলীগের টানা দুই কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক নেতা তানভীর ইসলাম কয়েক বছর ধরে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। অথচ তৃণমূল থেকে নাম পাঠানোর সময় তানভীরের নামই কেন্দ্রে পাঠাতে চাননি সাবেক মন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ ডিলু। যদিও জেলা-উপজেলার অন্য নেতাদের চাপে শেষ পর্যন্ত তানভীরসহ মোট তিনজন চেয়ারম্যান প্রার্থীর নাম কেন্দ্রে পাঠান তিনি।