ঋণের সুদহার বাড়াতে চায় ব্যাংকগুলো

তারল্য সংকট মেটাতে ৯-১০ শতাংশ সুদে আমানত জোগাড় করতে হয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংককে। আমানত সংগ্রহের ব্যয়ের সঙ্গে আরো সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ যোগ করে বিনিয়োগ করতে পারে ব্যাংকগুলো। ব্যাংকাররা মনে করেন, এ সুদে আমানত সংগ্রহ করে ১৩-১৪ শতাংশের নিচে বিনিয়োগ করলে তা ব্যাংকের ব্যবসায়িক মার্জিনকে খুবই সীমিত করে ফেলে।

এ পরিস্থিতি শুধু ন্যাশনাল ব্যাংকের নয়, বরং দেশের সিংহভাগ বেসরকারি ব্যাংকই সম্প্রতি সাড়ে ৯ থেকে ১০ শতাংশ সুদে আমানত সংগ্রহ করেছে। আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক আমানত নিয়েছে আরো বেশি ১২ শতাংশ সুদে। এছাড়া পদ্মা ব্যাংক আমানত জোগাড় করেছে ১১ শতাংশ সুদে।

বেসরকারি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীরা বলছেন, দেশের সিংহভাগ বেসরকারি ব্যাংক তারল্য সংকটে আছে। আগামী ৩১ মার্চের মধ্যে নতুন এডি রেশিও (ঋণ ও আমানতের অনুপাত) সমন্বয় করতে হবে। এজন্য ৯ থেকে সর্বোচ্চ ১২ শতাংশ পর্যন্ত সুদে প্রাতিষ্ঠানিক আমানত সংগ্রহ করতে হচ্ছে তাদের। গ্রাহকদের কাছ থেকেও প্রায় একই সুদে আমানত জোগাড় করতে হচ্ছে। এ অবস্থায় ঋণের সুদহার বাড়ানোর বিকল্প নেই।

এরই মধ্যে দেশের প্রথম সারির বেশ কয়েকটি ব্যাংক গ্রাহকদের ঋণের সুদহার বাড়াতে শুরু করেছে। কয়েকটি ব্যাংক এ মাসের মধ্যেই গ্রাহকদের কাছে সুদহার বাড়ানোর চিঠি দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।

বিদায়ী বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত একটি ব্যাংক থেকে বড় অংকের আমানত জোগাড় করেছে বেসরকারি ঢাকা ব্যাংক লিমিটেড। সাড়ে ৭ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত সুদহারে এ আমানত সংগ্রহ করেছে ব্যাংকটি। এ অবস্থায় ঋণের সুদহার অবশ্যই বাড়াতে হবে বলে জানান ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান।

বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ব্যাংকগুলোর তারল্য পরিস্থিতি ভালো নয়। সহসা এ সংকট কাটবে, এমন সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না। ক্ষুদ্র গ্রাহকদের কাছ থেকে আমানত না পেয়ে বেসরকারি ব্যাংকগুলো রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে আমানত সংগ্রহ করছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে আমানতের জন্য ১০ শতাংশ পর্যন্ত সুদ গুনতে হচ্ছে। কস্ট অব ডিপোজিটসহ অন্যান্য খরচ যুক্ত করলে ব্যাংক কোনোভাবেই ১৩ শতাংশের নিচে বিনিয়োগ করতে পারবে না। এ অবস্থায় ঋণের সুদহার বাড়ানো ছাড়া আমাদের হাতে কোনো বিকল্প নেই।

সহসাই ঋণের সুদহার বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন বেসরকারি খাতের আরো বেশ কয়েকটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। নতুন প্রজন্মের প্রায় সবক’টি ব্যাংক রয়েছে এ তালিকায়। যদিও এ ব্যাংগুলোর হাতে নতুন বিনিয়োগের মতো পর্যাপ্ত আমানত নেই বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ব্যাংকিং খাতে বিনিয়োগযোগ্য আমানত ছিল ৭৬ হাজার ৩৯৩ কোটি টাকা। এ আমানতের বড় অংশই রাষ্ট্রায়ত্ত ও বিদেশী ব্যাংকগুলোর হাতে। গত বছর শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর হাতে বিনিয়োগযোগ্য আমানত ছিল ৩৩ হাজার ৬৫৮ কোটি টাকা। তবে পর্যাপ্ত আমানত নেই বাংলাদেশ কৃষি ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের কাছে। এ দুটি বিশেষায়িত ব্যাংকের হাতে রয়েছে মাত্র ১০ কোটি টাকা।

৩১ ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি খাতের ৪০টি ব্যাংকের হাতে ২৫ হাজার ৫০৬ কোটি টাকার বিনিয়োগযোগ্য আমানত ছিল। এ আমানতের বড় অংশই ইসলামী ব্যাংক, প্রাইম, ব্যাংক এশিয়া, সিটি, ইস্টার্নসহ বেসরকারি খাতের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি ব্যাংকের হাতে। নতুন-পুরনো মিলিয়ে অন্তত ২০টি বেসরকারি ব্যাংকের হাতে বিনিয়োগযোগ্য কোনো তারল্য নেই। এর মধ্যে ১১টি ব্যাংকের এডি রেশিও নির্ধারিত সীমার ওপর রয়েছে।

তারল্য ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখতে রাষ্ট্রায়ত্ত শীর্ষ চার ব্যাংক থেকে আমানত সংগ্রহ করতে হচ্ছে বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে। সম্প্রতি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে ৯ দশমিক ২৫ শতাংশ সুদে আমানত নিয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। রাষ্ট্রায়ত্ত একটি ব্যাংক থেকে ৪০০ কোটি টাকা আমানত নিতে হয়েছে শীর্ষস্থানীয় ব্র্যাক ব্যাংককেও। এর মধ্যে সাড়ে ৯ শতাংশ সুদে নিয়েছে ২০০ কোটি টাকার আমানত।

উল্লেখ্য, তিন বছর আগে ব্যাংকগুলোর তারল্য ভালো থাকলেও আগ্রাসী বিনিয়োগের কারণে ঋণ প্রবৃদ্ধি বেড়ে যায়। সে তুলনায় আমানত প্রবৃদ্ধি না হওয়ায় তারল্য সংকট তৈরি হতে থাকে। ২০১৫-১৬ অর্থবছর বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয় ১৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা ১৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ হলেও পরবর্তী সময়ে ঋণ প্রবৃদ্ধি আরো বেড়ে যায়। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বেড়ে দাঁড়ায় ১৬ দশমিক ৯৪ শতাংশে। অন্যদিকে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ব্যাংকিং খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৩ দশমিক ৫২ শতাংশ। এর পরের দুই অর্থবছরে আমানতের প্রবৃদ্ধি আরো কমে আসে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আমানতের প্রবৃদ্ধি নেমে আসে মাত্র ১০ দশমিক ৬০ শতাংশে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ব্যাংকিং খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি আরো কমে হয় ১০ দশমিক ৩০ শতাংশ।