এবার দলে দলে আসছে বৌদ্ধ ও উপজাতীয়রা

রোহিঙ্গা মুসলিমদের পর এবার মিয়ানমারের সাধারণ বৌদ্ধ ও উপজাতিদেরও তাড়িয়ে দিচ্ছে সে দেশের সেনাবাহিনী। মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী দল আরাকান আর্মির (এএ) সঙ্গে সে দেশের সামরিক বাহিনীর ‘যুদ্ধাবস্থা’র কারণে জীবন বাঁচাতে দলে দলে বাংলাদেশে ঢুকছে দেশটির বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী, ম্রো, বোম, রাখাইন ও খুমী সমপ্রদায়ের মানুষেরা। এদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত আগেই বন্ধ ছিল, এখন পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। রাখাইনের কোনো অধিবাসী এখন থেকে বাংলাদেশে ঢুকতে পারবে না। গতকাল সফররত জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) বিশেষ দূত ও হলিউড অভিনেত্রী অ্যাঞ্জেলিনা জোলির সঙ্গে তার দফতরে বৈঠক শেষে তিনি একথা বলেন।

খুমী ও রাখাইনরা খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী। বান্দরবানের সীমান্তের প্রায় ২৫ কিলোমিটার অরক্ষিত পথ দিয়ে তারা ঢুকছে। কেবল রুমা উপজেলার ৭১ নম্বর পিলার দিয়ে গত কয়েকদিনে দুই শতাধিক উপজাতি সীমান্তরক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে ঢুকেছে বাংলাদেশে। কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ সীমান্ত দিয়েও ঢুকছে বার্মিজ বৌদ্ধরা। ফলে বাংলাদেশ সরকার বন্ধ করে দিয়েছে সীমান্ত। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত উ লুইনকে মঙ্গলবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করে তীব্র প্রতিবাদ ও সতর্ক করা হয়েছে।

বান্দরবানের স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, গত সোমবার রাতে বেশ কয়েকটি পরিবার রুমা সীমান্ত পার হয়ে চইখ্যং বমপাড়ায় ঢুকেছে। অনুপ্রবেশকারী ৩৫টি পরিবারের একটি তালিকাও করা হয়েছে। এখন গ্রামবাসী চাঁদা তুলে তাদের খাবারের যোগান দিচ্ছে। রেমাক্রি প্রানশা ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বারকে ঘটনাস্থল চইখ্যং বমপাড়ায় পাঠানো হয়েছে।

ইত্তেফাকের বান্দরবান প্রতিনিধি জানান, এমনই একটি উপজাতীয় শরণার্থী দলের ১২৪ জন সদস্য গত দুই দিন পাহাড়ে অবস্থানের পর বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে। রুমা সীমান্তের চইখ্যংপাড়া দিয়ে তারা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে বলে স্থানীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে। এরা হলো-মিয়ানমারের চীন স্টেটের প্লাটোয়া জেলার কান্তিলান পাড়ার ১২ খুমী পরিবারের ৪৮ জন, খামংওয়াং পাড়ার রাখাইন ২৩ পরিবারের ৭৬ জনসহ মোট ১২৪ জন। এদের মধ্যে শিশু রয়েছে ৫০ জনের বেশি। এছাড়াও বোম সমপ্রদায়ের প্রায় ১৫টি পরিবার রুমা সীমান্ত দিয়ে ঢুকে নিজ সমপ্রদায়ের বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে।

এদিকে বাংলাদেশে প্রবেশ করার পর এসব শরণার্থীর খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। ঘটনাস্থল অত্যন্ত দুর্গম ও সীমান্তের কাছাকাছি এসব এলাকায় বাংলাদেশ সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর কোনো অবস্থান নেই। ফলে বেশ সহজেই তারা এই সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করতে পারছে।

জেলা প্রশাসক মো. দাউদুল ইসলাম গতকাল সাংবাদিকদের বলেছেন, সীমান্তের জিরোলাইনের কাছে ১২টি খুমী পরিবারের নারী, পুরুষ ও শিশুসহ মোট ৪৮ জন এবং ২৩টি রাখাইন পরিবারের মোট ৭৬ জন সদস্য অবস্থান করছে। তবে জিরো লাইনে থাকা শরণার্থীরা কোনোভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে যাতে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য সীমান্তে বাড়তি সতকর্তা জারি হয়েছে বলে জানান বান্দরবান বিজিবির সেক্টর কমান্ডার কর্নেল জহিরুল ইসলাম।

এদিকে বার্মিজ বৌদ্ধ, ম্রো, বোম, রাখাইন, খুমী সম্প্রদায়ের লোকজন পার্বত্য এলাকায় ঢুকে পড়ার কারণে স্থানীয়রা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, বহু বছর আগে ঠিক এভাবেই বাংলাদেশে আসে চাকমা, মারমা, বোম, মুরং ও রাখাইনরা। এখন যারা আসছে তারাও একই সম্প্রদায়ের। দৈহিক গঠন ও ভাষা একই রকম হওয়ায় অচিরেই স্থানীয় চাকমা, মারমা, বোম, মুরং ও রাখাইনদের সাথে আগতরা মিশে যেতে পারে। গত কয়েকদিনে আসা ম্রোরা এখনো সীমান্তের কাছে শিবিরে থাকলেও বোমরা ইতোমধ্যে সীমান্তবর্তী বোম পাড়ায় মিশে গেছে। মিয়ানমারের বাসিন্দাদের সংখ্যা বাড়তে থাকলে পার্বত্য চট্টগ্রাম ঘিরে তথাকথিত জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠার দাবি শক্তিশালী হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

প্রসঙ্গত যে, ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারে সামরিক বাহিনী মুসলমান রোহিঙ্গা অধ্যুষিত রাখাইন রাজ্যে নির্বিচারে গণহত্যা ও নির্যাতন চালায়। এতে দেশটি থেকে কমপক্ষে সাত লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে দেশটি থেকে আরও চার লাখের বেশি রোহিঙ্গা এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। জাতিসংঘের সহযোগিতায় কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ায় তাদের জন্য শরণার্থী শিবির খোলা হয়েছে। তাদের দেশে ফেরত পাঠাতে অব্যাহত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। এখন রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি উপজাতিরা আসতে থাকায় নতুন সংকটের সৃষ্টি হচ্ছে।

মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্ত পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে:পররাষ্ট্রমন্ত্রী

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মূলত আরাকান আর্মি ও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষের কারণে রোহিঙ্গাদের পর এবার বৌদ্ধসহ অন্যান্য নৃগোষ্ঠীর লোকেরা দেশ ছাড়ছেন। তারা দেশ ছেড়ে বাংলাদেশে আসছেন। তবে আমরা সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছি। সীমান্ত খুলে দিতে আন্তর্জাতিক চাপ আসলে সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ কি করবে- এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, আমরা আগেই ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছি, এখন অন্যরা তাদের সীমান্ত খুলতে পারে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের সঙ্গে বৈঠকে অ্যাঞ্জেলিনা জোলি বলেন, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।