ভারতের বিশ্বাস-অবিশ্বাসে বিএনপি

সম্প্রতি কয়েক বছরে বিএনপি ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্ক মোটেও মধুর নয়। দুই পক্ষের বৈরিতা শুধু নানা আলোচনারই জন্ম দিয়েছে; কোনো সুফল পায়নি বিএনপি। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভারতের একচ্ছত্র সমর্থন পাওয়ার পর এখন বিএনপির ভেতরে ফের আলোচনা চলছে দলটির সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কেমন হবে, এ নিয়ে। বিএনপির সঙ্গে ভারতের সম্পর্কে যে বরফ জমেছে, সেটি গলানোর প্রথম ধাপ হতে পারে বিএনপির জামায়াত-সঙ্গত্যাগ। সংশ্লিষ্টরা এমনটিই মনে করছেন।

বিএনপির নেতৃবৃন্দের অনেকের মধ্যেই ভারতবিরোধী মনোভাব দৃঢ়। কিন্তু জাতীয় ও উপমহাদেশীয় রাজনীতিতে অভিজ্ঞ নেতারা বলছেন, শুধু বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করা সমীচীন হবে না। দেশের হয়ে কথা বলতে গেলে ক্ষেত্রবিশেষে ভারতের বিপক্ষে কিছু বক্তব্য হয়তো যাবে। তবু তারা ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন চান এবং সরাসরি ভারত-বিরোধিতা থেকে বিরত থাকতে চান। দশম ও একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপির পক্ষ থেকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বরফ গলানোর ব্যাপক আগ্রহ প্রকাশ করা হলেও সাড়া মেলেনি নয়াদিল্লির। এখন সম্পর্ক উন্নয়ন করতে হলে ভারতেরই উদ্যোগ নিতে হবে। বল এখন ভারতের কোর্টে বলেই মনে করছে বিএনপি।

অবশ্য দুপক্ষের বিশ্বাস ও আস্থায় এমন ফাঁটল রয়েছে যে, সম্পর্ক উন্নয়নের শুরুতে প্রয়োজন হয়ে পড়েছে আস্থা অর্জন। অতীতে বিএনপি একাধিকবার শিষ্টাচার-বহির্ভূত আচরণ করেছে ভারতের সঙ্গে। এরপর গত কয়েক বছরে বিএনপির পক্ষে সম্পর্ক উন্নয়নে সর্বাত্মক চেষ্টা করা হলেও ভারত সায় দেয়নি। দেশটির নজর ছিল আওয়ামী লীগের দিকেই।

ভারতের বিভিন্ন থিঙ্কট্যাংক মনে করে, বিএনপির পাকিস্তানপন্থি ভূমিকা এবং জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়াটা বড় সমস্যা। ব্যক্তি তারেক রহমানের চেয়ে তার বিভিন্ন ‘কানেকশনে’ও ভারতের আপত্তি আছে। এখনো ভারত এবং তারেক রহমান দুদিক থেকেই পরস্পরের প্রতি একটা সন্দেহ ও অবিশ্বাস রয়ে গেছে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু আমাদের সময়কে বলেন, ‘ভারত বড় দেশ। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশও। ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে তাদের সঙ্গে আমাদের ভালো সম্পর্ক দরকার। কিন্তু এটা শুধু আমরা চাইলেই হবে না, ভারতকেও চাইতে হবে। তারা যদি একটি দলের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখতে চায় তা হলে ভবিষ্যতে যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় তার দায়ও এড়াতে পারবে না।’ তিনি মনে করেন, সম্পর্কটা ‘উইন উইন’ পর্যায়ে হতে হবে। দুই পক্ষকে সমান পর্যায়ে থাকতে হবে। দুই পক্ষের স্বার্থকে সমুন্নত রাখতে হবে। বিএনপির একটি সূত্র বলছে, নির্বাচনের পরও তারা ভারতবিরোধী অবস্থানে যাবেন বলে সেসব খবর শোনা যাচ্ছে তা সঠিক নয়। দলীয় এমন সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে বাংলাদেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে কোনো কাজ করলে তার প্রতিবাদ জানাবে দল। প্রয়োজনে কর্মসূচিও দিতে পারে। ইতোমধ্যে সীমান্ত হত্যা নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছেন নেতাদের কেউ কেউ।

দলের সদ্য বিলুপ্ত বৈদেশিক সম্পর্ক কমিটির কয়েকজন এবং জ্যেষ্ঠ অন্তত তিন নেতার সঙ্গে ভারত ও বিএনপি সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়। তারা বলেন, দলের ভেতর মধ্য সারির নেতাদের চাপ আছে ভারতবিরোধী মনোভাব তৈরি করা। এমনকি দলের কট্টরপন্থিদের একটি অংশও বিএনপির কূটনৈতিক নীতি পরিবর্তন করার দাবি ওঠাচ্ছেন।

অভিজ্ঞ জ্যেষ্ঠ নেতারা যদিও মনে করেন, অতীতের মতো কোনো ভুল করা যাবে না। এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না, যাতে সম্পর্ক নষ্ট হয়। তারা বলেন, বিশ্ব রাজনীতিতে এখন পরিবর্তন এসেছে। শত্রু পক্ষের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে। ট্রাম্প-কিম বৈঠক হয়েছে। দুই কোরিয়ার বৈঠক হয়েছে। এসব বৈঠক একটি বার্তা দেয়, শত্রুর সঙ্গেও সংলাপ চালাতে হবে।

বর্তমান বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা অধিকাংশ রাষ্ট্রও এই অঞ্চলে সিদ্ধান্তের বিষয়ে ভারতের ওপর নির্ভরশীল। তাই দেশগুলো বরাবরই বিএনপিকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ওপর জোর দিচ্ছিল।

২০১২ সালে খালেদা জিয়ার ভারত সফরে দুই পক্ষের মধ্যে যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, খালেদা জিয়া দেশে ফেরার পর ‘হঠকারী’ কয়েকটি সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তিক্ততার শুরু হয়। ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে বৈঠক বাতিল করে অসৌজন্য দেখানো হয়েছে। এর পেছনে কট্টরপন্থি দুই বুদ্ধিজীবীকে দায়ী করা হয়। তাদের পরামর্শে ওই সময় এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন খালেদা জিয়া।

বিএনপি নেতা এবং কূটনীতিক সূত্রগুলো বলছে, বরাবরই ভারত বিএনপিকে সম্পর্ক উন্নয়নে কয়েকটি শর্ত দিয়ে আসছে। এর মধ্যে প্রধান দুই শর্ত হচ্ছে এক. জামায়াত ছাড়তে হবে বিএনপিকে। দুই. আপাতত তারেক রহমানকে নেতৃত্ব থেকে দূরে থাকতে হবে।

বিএনপি থেকে ভারত গিয়ে অথবা বাংলাদেশের ভারতের বিভিন্ন পর্যায়ের বৈঠকে এই দুই শর্ত নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু বিএনপির কোনো ফোরামেই এ নিয়ে কেউ আলোচনা তুলতে ‘সাহস’ পাননি। জামায়াত নিয়ে ঘুরেফিরে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হলেও তারেক রহমানের বিষয়টি সব সময় আলোচনার বাইরে ছিল। কারণ দলে তার যে অনুসারীরা রয়েছেন, তারা এমন একটি বলয় তৈরি করেছেন যে, এই আলোচনা যে তুলবেন তাকেই রোষানলে পড়তে হবে।

কূটনৈতিক সম্পর্কগুলো বলছে, একবার খালেদা জিয়ার লন্ডন সফরকালে ভারতের উচ্চপদস্থ কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে ব্রাসেলসে বৈঠক ঠিক করা হয়। ভারতের একজন সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের উচ্চপর্যায়ের নেতা সেখানে চলে গিয়েছিলেন। আরেকজন কর্মকর্তা তখন বিমানে ছিলেন। গন্তব্যস্থলে পৌঁছে তিনি জানতে পারেন বৈঠক বাতিল করা হয়েছে।

জানা গেছে, বৈঠকের আগে ভারত শর্ত দিয়েছিল; তারেক রহমান থাকতে পারবেন না। তাই তারেক রহমানের সিদ্ধান্তে বৈঠক বাতিল করা হয়েছে। প্রবণ মুখোপাধ্যায়ের পর এই বৈঠক বাতিল করায় চরম ক্ষুব্ধ হয়েছে ভারত।

বিএনপি নেতারা বলছেন, নির্বাচনের পর কিছুদিন রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবেন তারা। ভারতের মনোভাব কী ধরনের তৈরি হয় তাও দেখবেন তারা। তারপর সিদ্ধান্ত হবে কূটনীতি কোন দিকে যাবে।

বাংলাদেশে এবারের সাধারণ নির্বাচনের বেশ কয়েক মাস আগে থেকেই বিএনপি নেতারা যেভাবে দিল্লি সফর করছিলেন তাতে এটা পরিষ্কার ছিল যে তারা ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে শুরু করতে চান। তারা অনেকেই বলছেন, নির্বাচনে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগকে খোলাখুলি সমর্থন না করে ভারত অন্তত একটা নিরপেক্ষতা বজায় রাখুক, বস্তুত সেটাই ছিল দিল্লির কাছে বিএনপির অনুরোধ। সম্ভবত সে কারণেই তিস্তা চুক্তির মতো ইস্যুকেও তারা নির্বাচনে একেবারেই ব্যবহার করেনি। কিন্তু নির্বাচনে একেবারেই ভারতকে পাশে পায়নি দলটি।

সম্প্রতি বিবিসি বাংলা তাদের একটি প্রতিবেদনে বলেছে, ভারতে এসে বিএনপির প্রতিনিধিরা যাদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন তাদের অন্যতম বিজেপির পলিসি রিসার্চ সেলের সিনিয়র সদস্য অনির্বাণ গাঙ্গুলি। তার মতে, জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্কই আসলে এই সমস্যার মূলে। জামায়াতের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক তারা আগে পরিষ্কার করুক। ওটা নিয়ে তারা লুকোচুরি খেলেই যাচ্ছে।

ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মুচকুন্দ দুবে ঢাকাতেও ভারতীয় হাইকমিশনার হিসেবে বহু বছর দায়িত্ব পালন করেন। তিনিও বিবিসিকে বলেছিলেন, ‘আমরা কী করে ভুলি খালেদা জিয়ার আমলে দুদেশের সম্পর্ক একেবারে থমকে গিয়েছিল?’ তিনি জানান, ভারতের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর বদ্ধমূল ধারণা চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে বিএনপি আমলে যে দশ ট্রাক অস্ত্র পাচার করার চেষ্টা হয়েছিল তাতে আইএসআই তথা পাকিস্তান সরকারের প্রত্যক্ষ যোগসাজশ ছিল।

ঢাকার ভারতীয় দূতাবাসে বহু বছর কাজ করে আসা নিরাপত্তা বিশ্লেষক শান্তনু মুখার্জির কথায়, প্রথম সমস্যা হলো বিএনপির পাকিস্তানপন্থি ভূমিকা। ভারতের চেয়ে তারা যে পাকিস্তানের অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ, সেটা তো সহজেই বোঝা যায়। তা ছাড়া খালেদা জিয়ার আমলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আসামের আলফা কিংবা মণিপুর-নাগাল্যান্ডের জঙ্গিরাও বাংলাদেশে আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়েছে বলে ভারতের কাছে প্রমাণ আছে, আর সেটাও ছিল আমাদের জন্য খুবই বিপজ্জনক।

ভারতের খ্যাতিসম্পন্ন থিঙ্কট্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিস অ্যান্ড অ্যানালিসিস মনে করে, আপত্তিটা ঠিক ব্যক্তি তারেক রহমানকে নিয়ে নয়, বরং আইএসআই ও জামায়াতের সঙ্গে তার কথিত যোগসাজশ নিয়ে। এখনো ভারত এবং তারেক রহমান দুদিক থেকেই পরস্পরের প্রতি একটা সন্দেহ ও অবিশ্বাস রয়ে গেছে।